মাটির সঙ্গে কড়ি বেঁধে নারীদের মানত, সোনারগাঁয়ে শুরু হয়েছে শতবর্ষী 'বউ মেলা'
সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী বটবৃক্ষের বটতলায় অনুষ্ঠিত এই মেলা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। শতবর্ষী বটগাছকে ঘিরেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই আয়োজন, যা স্থানীয়দের কাছে ‘সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলা’ নামে সুপরিচিত।
সকালের প্রথম প্রহর থেকেই বটতলার আশপাশ এলাকায় দেখা যায় ভক্তদের ঢল। নববধূ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী সবাই ফল-ফলাদি, মিষ্টান্ন ও পূজার সামগ্রী নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বটবৃক্ষের নিচে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। রঙিন শাড়ি, ফুলেল সাজ আর ধর্মীয় আবহে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বর্ণিল উৎসবে। কুমারী মেয়েরাও অংশ নেয় এ আয়োজনে, যা মেলাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই বটবৃক্ষটি ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। প্রতি বছর নববর্ষে এই বটতলায় পূজা দিলে সংসারে সুখ-শান্তি আসে, স্বামী-সন্তানের মঙ্গল হয়। এমন বিশ্বাস থেকেই নারীরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই দিনের জন্য। অনেকেই মানত পূরণের অংশ হিসেবে কবুতর ওড়ানো এবং পাঁঠা বলিও দিয়ে থাকেন।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সমাহার। মৃৎশিল্পীদের তৈরি টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, পাখি, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা ধরনের সামগ্রী ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ে। পাশাপাশি বাঁশ, কাঠ ও লৌহশিল্পের তৈরি নানান ব্যবহার্য জিনিসপত্র এবং বাহারি মিষ্টান্ন ও মন্ডা-মিঠাইয়ের দোকান মেলাকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের জন্যই এখানে রয়েছে আনন্দের খোরাক।
মেলায় আগত নারীরা জানান, পারিবারিকভাবে বড়দের কাছ থেকে এই মেলার গুরুত্ব সম্পর্কে শুনে আসছেন তারা। প্রতি বছরই তারা এখানে এসে পূজা দেন এবং সংসারের কল্যাণ কামনা করেন। তাদের বিশ্বাস, এই পূজা তাদের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য বলেন, বহু বছর ধরে এ মেলা ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দুপুরে আনুষ্ঠানিক পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে মূল কার্যক্রম শুরু হয় এবং দিনভর চলে ভক্তদের আগমন।
আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা নিলোৎপল রায় জানান, প্রতি বছর নববর্ষ উপলক্ষে সিদ্ধেশ্বরী কালীপূজার আয়োজন করা হয় এবং এটি সম্পূর্ণ সার্বজনীনভাবে উদযাপিত হয়। এখানে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ই নয়, ভিন্ন ধর্মের মানুষও অংশ নেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, মেলাকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নারী-কেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অনন্য সংমিশ্রণে সোনারগাঁয়ের এই বউমেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়। এটি হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের প্রাণের উৎসব, যা যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন