সোনারগাঁয়ে চাঞ্চল্যকর উমায়ের হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার, জামিন নামঞ্জুর
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারোয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সূত্র, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফারুক হোসেন দীর্ঘদিন ধরে শম্ভুপুরা, হোসেন্দী ও আশপাশের এলাকায় ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিল। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নদীপথে অবৈধ কারবার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় তার নাম উচ্চারণ করতেও সাধারণ মানুষ ভয় পেত বলে দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর ফারুক তার সহযোগী সোহাগ ও বায়েজিদকে সঙ্গে নিয়ে উমায়ের নামে এক যুবককে ফোন করে ডেকে নেয়। পরে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে মরদেহ মেঘনা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নিখোঁজের তিনদিন পর মুন্সীগঞ্জ নৌ-পুলিশ নদী থেকে উমায়েরের মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের মা আনার কলি প্রথমে সোনারগাঁ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে তদন্তের ভিত্তিতে সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফারুকের বিরুদ্ধে আলী মাতাব্বর হত্যা মামলাসহ আরও অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। একটি অস্ত্র মামলায় তার ১৭ বছরের সাজা হয়েছিল। তবে পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে আবারও এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ফারুক শুধু একজন সন্ত্রাসীই নয়, সে ছিল একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রক। নদীপথ ব্যবহার করে মাদক চোরাচালান, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখাই ছিল তার প্রধান কর্মকাণ্ড।
অভিযোগ রয়েছে, তার ছোট ভাই মাসুদও মাদক মামলার আসামি এবং কারাভোগ করেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দুই ভাই মিলে দীর্ঘদিন ধরে নদীপথে মাদকের বড় বড় চালান নিয়ন্ত্রণ করত।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
ফারুক ছিল এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই হুমকি আসতো। অনেকেই ভয়ে মামলা পর্যন্ত করতে সাহস পেত না।
আরেকজন বলেন,চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মারধর, মাদক এমন কোনো অপকর্ম নেই যা সে করেনি। সে নিজেকে এলাকার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক মনে করত।
এক বৃদ্ধ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিনে দিনে সে এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে সাধারণ মানুষ সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতেও ভয় পেত। তার গ্রেপ্তারে এখন মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, হোসেন্দী ইউনিয়নের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান আক্তার হাজীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ‘শুটার ম্যান’ হিসেবেও এলাকায় পরিচিত ছিল ফারুক। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকেই সে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিহত উমায়েরের মা আনার কলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
আমার ছেলেকে ফোন করে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমি একজন মা হিসেবে প্রতিদিন ছেলের জন্য কাঁদি। যারা আমার বুক খালি করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই। এতদিন আমরা আতঙ্কে ছিলাম, আজ অন্তত একজন ধরা পড়েছে।
উমায়েরের স্ত্রীও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আমার স্বামী কোনো অপরাধ করেনি। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার সন্তানের বাবার হত্যার বিচার চাই। যারা এ হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে যেন ছাড় না দেওয়া হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, ফারুক গ্রেপ্তার হলেও তার সহযোগীরা এখনও এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তারা দ্রুত সকল সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ভীতির কারণে ফারুকের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। তবে সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং তারা আশা করছেন, এবার হয়তো সন্ত্রাস ও মাদকের ভয়াল ছায়া থেকে মুক্তি পাবে পুরো এলাকা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন