আবুল খায়ের গ্রুপের থাবা: খাঁ খাঁ করে গিলে খাচ্ছে মসজিদ ও নদীসহ শত বিঘা জমি!
সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি: উন্নয়ন বা শিল্পায়নের নামে কর্পোরেট আগ্রাসনের এক চরম নজির স্থাপিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে। আনন্দ বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জমি কেনার আড়ালে মেঘনার শাখা নদী মেনিখালি, সরকারি খাস জমি, আষারিয়াচর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পবিত্র সম্পত্তি এবং সাধারণ মানুষের পৈতৃক শত বিঘা জমি জোরপূর্বক বালু দিয়ে ভরাট করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আবুল খায়ের গ্রুপ-এর বিরুদ্ধে। আইনের তোয়াক্কা না করে চলা এই বেপরোয়া লুণ্ঠনে চরম ক্ষুব্ধ ও অসহায় হয়ে পড়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন মাস আগে আনন্দ বিল্ডার্সের জমি অধিগ্রহণের পর থেকেই আবুল খায়ের গ্রুপের লোকজন আশপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। মেঘনার শাখা নদী মেনিখালিতে অবাধে বালু ফেলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে এর ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এলাকায় মারাত্মক জলাবদ্ধতা এবং অপূরণীয় পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই ভূমিদস্যুতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি মহান আল্লাহর ঘর মসজিদও। স্থানীয়দের অভিযোগ, আষারিয়াচর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের প্রায় ৩০ শতাংশ জমিসহ সরকারি সম্পত্তি জোরপূর্বক ভরাট করা হচ্ছে। ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠানে আঘাত হানা হচ্ছে, যা মুসল্লিদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হেনেছে।
স্থানীয়দের ওপর নির্যাতন ও জুলুমের চিত্র আরও ভয়াবহ। চর রমজান সোনাউল্লা মৌজায় আর.এস আব্দুল খালেক ও নুরুল ইসলামের ২ বিঘা, আষাড়িয়ারচর মৌজায় আর.এস ১১৪৪ দাগে ৬ বিঘা, ২৫০৮ ও ২৫৮৮ দাগে ৯ বিঘা, বি.এস ৪৫০৬ দাগে ৮ বিঘা এবং মসজিদের ১ বিঘাসহ মেনিখালি নদীর খাস জায়গাসম্পৃক্ত প্রায় শত বিঘা জমি বালু দিয়ে গ্রাস করা হচ্ছে। চারপাশ থেকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সাধারণ মালিকদের নিজ জমিতে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী নিয়াজ আহমেদ আক্ষেপ করে বলেন, জমির মালিক হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় কিছু ভূমিদস্যুর শক্তিতে চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। প্রতিবাদ করলেই আমাদের নামে মিথ্যা মামলা ও পুলিশ দিয়ে জেল খাটানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এলাকাবাসীর আকুতি, দিনের পর দিন এই অন্যায় সহ্য করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। নদী ও মসজিদের জায়গা রক্ষায় তারা অবিলম্বে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এদিকে, এই অনিয়ম ও দখলের চিত্র ক্যামেরাবন্দি বা সত্যতা যাচাই করতে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে সেখানে চরম ঔদ্ধত্য দেখান আবুল খায়ের গ্রুপের সিকিউরিটি ইনচার্জ বিল্লাল হোসেন। কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে মারার ভঙ্গিতে তেড়ে আসেন, যা তাদের অপরাধমূলক ও বেপরোয়া মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
নদী ও জনপদের এই করুণ দশা দেখে সচেতন মহল অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে মেনিখালি নদী দখল ও ভরাট বন্ধ, অবৈধ গেট অপসারণ এবং জমির মালিকানা যাচাই করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবুল খায়ের গ্রুপের প্রজেক্ট হেড জাকির হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করে বারবার কেটে দেন, যা তাদের অপরাধমূলক লুকোচুরিরই স্পষ্ট লক্ষণ।
এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত জানান, এ বিষয়ের একটি অভিযোগ এসিল্যান্ডকে দেয়া হয়েছে। তদন্তপূর্বক দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে দখলমুক্ত করা হবে।
প্রশাসনের এই আশ্বাসের পর এখন দেখার বিষয়, প্রভাবশালী আবুল খায়ের গ্রুপের এই আগ্রাসী থাবা থেকে সোনারগাঁয়ের জনপদ, নদী ও মসজিদ রক্ষা পায় কি না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন